
মোঃ শামীম হোসেন
কো-অর্ডিনেটর
বিএনপি গ্রাসরুটস নেটওয়ার্ক,
কুড়িগ্রাম-০১.
বাংলাদেশের সর্বউত্তরের প্রান্তে, তিনদিকে সীমান্তে বেষ্টিত এক জনপদ— কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলা। দক্ষিণে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার, আর উত্তর-পূর্ব-পশ্চিমে সীমান্তের রেখা টেনে দিয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্তঘেঁষা জনপদটিকে দেখানো হয়েছে অবহেলার চোখে; প্রশাসনিক মহলে একসময় এটি ছিল কথিত ‘পানিশমেন্ট পোস্টিং’। এমনকি বাংলা চলচ্চিত্রের সংলাপেও ভেসে উঠেছে—“বেশি বাড়াবাড়ি করলে পোস্টিং হবে বান্দরবান না হয় ভুরুঙ্গামারী!”
কিন্তু প্রশ্ন জাগে—কোনো জনপদের সম্ভাবনা কি তার ভৌগোলিক দূরত্বে মাপা যায়? একটি সীমান্ত উপজেলা কি শুধুই প্রান্তিকতার প্রতীক, নাকি সঠিক পরিকল্পনায় তা হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির প্রবেশদ্বার?
আজ সময় এসেছে ভুরুঙ্গামারীকে নতুন আলোয় দেখার। কারণ এই মাটিই জন্ম দিয়েছে বহু মেধাবী সন্তানকে—যারা দেশ-বিদেশে গবেষণা, প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সুনাম কুড়িয়েছেন।সম্ভাবনা আছে, শুধু প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা।
পরিকল্পনা গুলো জেনে নেই সকলেই রাষ্ট্র কে জানিয়ে দেই-
১. সোনাহাট স্থলবন্দর ও ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগ পুনরুজ্জীবন-
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বাগভাণ্ডার হয়ে সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের আসামের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল। প্রায় তিন-চার যুগ ধরে বন্ধ থাকা এই রুটটি পুনরায় চালু করা গেলে ভুরুঙ্গামারী একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরে রূপ নিতে পারে।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে ভুরুঙ্গামারীর ভেতর দিয়ে মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার সড়ক বা রেলপথ করিডোর চালু করা গেলে কলকাতা থেকে আসামগামী পথ উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত হবে। এতে—
ক) বাংলাদেশের রাজস্ব আয় বাড়বে
খ) স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
গ) ট্রানজিট বাণিজ্য ও লজিস্টিক খাত প্রসারিত হবে।
একটি ছোট অবকাঠামোগত সংযোগই হতে পারে বৃহৎ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা।
২. ভুটান-সংযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট-
ভুরুঙ্গামারী থেকে ভুটান সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ৭৬ কিলোমিটার। আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান ত্রিপাক্ষিক সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে এই অঞ্চল একটি ট্রানজিট ও ট্রেড হাবে পরিণত হতে পারে।
ভুটানের অসমাপ্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ দ্রুত সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ অংশীদার হলে, ভুরুঙ্গামারী হবে সেই প্রবেশদ্বার। এতে—
ক) আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে
খ) সীমান্ত অর্থনীতি শক্তিশালী হবে
গ) তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে
৩. চিলমারী-রৌমারী সেতু: উত্তরাঞ্চলের লাইফলাইন-
রংপুর বিভাগ থেকে ঢাকার দূরত্ব কমাতে চিলমারী-রৌমারী সেতু অত্যন্ত জরুরি। বড় বাজেট সম্ভব না হলে অন্তত রেলসেতু নির্মাণ করে পণ্য পরিবহনের পথ সুগম করা যেতে পারে।
এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও কুটিরশিল্প দ্রব্য দ্রুত রাজধানী ও বন্দরনগরীতে পৌঁছাবে।
ক)ফলে উৎপাদন বাড়বে
খ)বাজার সম্প্রসারিত হবে
গ)আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে।
৪. নদীপথের পুনর্জাগরণ
কুড়িগ্রাম জেলা ১৬টি নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত। ভুরুঙ্গামারীর প্রাণরেখা দুধকুমার নদী। নিয়মিত ড্রেজিং ও আধুনিক নৌপথ উন্নয়ন করা গেলে এই নদীপথ সরাসরি ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব।
নদীপথ সচল হলে—
পরিবহন ব্যয় কমবে
পরিবেশবান্ধব বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে
নদীকেন্দ্রিক শিল্পায়ন সম্ভব হবে
৫. চরাঞ্চল:
অভিশাপ থেকে আশীর্বাদ
চরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের প্রতীক। অথচ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় এগুলো হতে পারে শিল্পপার্ক, কৃষি-প্রসেসিং জোন কিংবা পর্যটনকেন্দ্র। সঠিক মনিটাইজেশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে চরাঞ্চলকে উৎপাদন ও পর্যটনের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
ক) এতে স্থানীয় মানুষ পুনর্বাসিত হবে
খ) নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং
গ) আঞ্চলিক অর্থনীতি বহুগুণে সম্প্রসারিত হবে।
৬. সীমান্ত হাট ও জনসম্পৃক্ত অর্থনীতি
সীমান্তবর্তী উপজেলা হিসেবে ভুরুঙ্গামারীতে সীমান্ত হাট চালু করা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। এটি হবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও কারিগরদের জন্য এক বিশাল সুযোগ।
সীমান্ত হাট মানে শুধু বাণিজ্য নয়—এটি সংস্কৃতি বিনিময়, পারস্পরিক আস্থা ও আঞ্চলিক শান্তির সেতুবন্ধন।
প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের আহ্বান
ভুরুঙ্গামারী কোনো প্রান্তিক জনপদ নয়; এটি একটি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জনপদ। প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ এবং সংসদে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার উপস্থাপন।
আমরা চাই, এই স্বপ্নগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছাক ভুরুঙ্গামারীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপজেলা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হোক।
কারণ উন্নয়ন কখনো কেন্দ্র থেকে প্রান্তে যায় না—উন্নয়ন শুরু হয় প্রান্তের সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।






