সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুরে স্মরণকালের বৃহত্তম যৌথ অভিযান অব্যাহত

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

★ প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র‍্যাব সদস্য, ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রয়েছে ১৫টি এপিসি সাঁজোয়া যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ। পাহাড়ি এলাকায় নজরদারির জন্য ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে স্মরণকালের বৃহত্তম যৌথ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় তিন হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ সাঁড়াশি অভিযান এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযানের মূল লক্ষ্য চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং এলাকায় সক্রিয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপকে দমন করা। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
রবিবার দিবাগত গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সব প্রবেশপথ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর সোমবার ফজরের আগেই কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযান মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র‍্যাব সদস্য, ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রয়েছে ১৫টি এপিসি সাঁজোয়া যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ। পাহাড়ি এলাকায় নজরদারির জন্য ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে।
৯ মার্চ সোমবার ভোরের আগে নগরীর আগ্রাবাদ ছোটপুল পুলিশ লাইন্স থেকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য গাড়িবহর নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। একই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে যৌথবাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা এলাকাটিতে অবস্থান নেন। প্রথমে এলাকার সব প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ধাপে ধাপে পাহাড়ি বসতিগুলোতে তল্লাশি শুরু করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ইয়াছিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপসহ কয়েকটি সন্ত্রাসী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ইয়াছিন গ্রুপকে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনাসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযানের বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হলেও আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, অপরাধীরা গোপন সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে অভিযানের খবর আগেই জেনে যায়। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ ঠেকাতে সড়কের একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলে এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে যৌথবাহিনী এলাকায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
অভিযানের সময় সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম থেকে ১০ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি অভিযানের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। অসংখ্য সরু পথ, ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতির কারণে অপরাধীরা সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারে। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ জঙ্গল সলিমপুর
চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছাকাছি হলেও জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং এলাকা হিসেবে পরিচিত। অনেকেই এলাকাটিকে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ বা ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ বলে উল্লেখ করেন।
বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জনপদে বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস এখানে। অপরিকল্পিত বসতি, সরু রাস্তা ও দুর্গম পাহাড়ি পথের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে র‍্যাব সদস্যরা হামলার মুখে পড়েন। ওই সময় র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরও তিনজন সদস্য আহত হন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করা হয় এবং এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ওই হামলায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন অংশ নেয়। ঘটনার পর থেকেই এলাকাটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয় এবং সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধারে বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে এবার শুরু হয়েছে সমন্বিত এই সাঁড়াশি অভিযান।
গত প্রায় ২০ মাসে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ইয়াছিন ও রোকন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও জমি দখলকে কেন্দ্র করেও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলমান এই যৌথ অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন এবং স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সোমবার বিকাল পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের ভেতরের বসতি ও সন্দেহভাজন স্থাপনাগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছেন। দুর্গম পথ ও ঘনবসতির কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযানের শুরুতে ড্রোন উড়িয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করা হয়। পরে সেনাবাহিনীর এপিসি সাঁজোয়া যান, পুলিশের জলকামান, সাজোয়া যান ও ডগ স্কোয়াডসহ ভারী অস্ত্রসজ্জিত গাড়িবহর নিয়ে যৌথবাহিনী পাহাড়ের ভেতরে প্রবেশ করে। সম্ভাব্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অ্যাম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে কিছু অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. রাসেল বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।”
এদিকে র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধ ও সন্ত্রাসমুক্ত করতেই এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে এটি আরও বিস্তৃত করা হবে।”
পুলিশের আরেক কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, “অভিযান চলমান থাকায় এখনই অস্ত্র উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে। এলাকায় ভবিষ্যতে অভিযান পরিচালনা সহজ করতে যৌথবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ দমন ও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Related Posts

রাঙামাটিতে মাদকাসক্ত ছেলেকে দা দিয়ে কোপের অভিযোগ, হাসপাতালে মৃত্যু

  রাঙামাটি প্রতিনিধি: মো নাজিম আলী রাঙামাটি শহরের আসামবস্তি এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে মাদকাসক্ত এক যুবককে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে তার মা-বাবার বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয়রা…

কালিয়াকৈরে হানিট্যাপ চক্রের ৪ সদস্য আটক

শাকিল হোসেন,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধিঃ   গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে জিম্মি ও ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগে কথিত ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের দুই নারী ও এক পুলিশ সদস্যসহ মোট চারজনকে আটক করেছে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You Missed

রাঙামাটিতে মাদকাসক্ত ছেলেকে দা দিয়ে কোপের অভিযোগ, হাসপাতালে মৃত্যু

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 2 views
রাঙামাটিতে মাদকাসক্ত ছেলেকে দা দিয়ে কোপের অভিযোগ, হাসপাতালে মৃত্যু

কালিয়াকৈরে হানিট্যাপ চক্রের ৪ সদস্য আটক

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 5 views
কালিয়াকৈরে হানিট্যাপ চক্রের ৪ সদস্য আটক

অবৈধ ভিওআইপির দায়ে গ্রামীণফোনকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 5 views
অবৈধ ভিওআইপির দায়ে গ্রামীণফোনকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা

ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার পরিত্যক্ত বাসভবনে মিলল ঝুলন্ত মরদেহ

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 5 views
ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার পরিত্যক্ত বাসভবনে মিলল ঝুলন্ত মরদেহ

বাবার দাফন শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে নিজের মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনলেন পিতা

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 5 views
বাবার দাফন শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে নিজের মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনলেন পিতা

রংপুরে গাঁজাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার

  • By Admin
  • July 25, 2026
  • 5 views
রংপুরে গাঁজাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার