সাকিব আহসান
প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট শহর পীরগঞ্জ একসময় যার পরিচিতি ছিল শান্ত, নিরিবিলি ও সহনশীল জনপদ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্রে পরিবর্তন আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়দের মুখে একটি সাধারণ উদ্বেগই বারবার উঠে আসছে নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা এবং মাদক বেচাকেনার বিস্তার পীরগঞ্জের সামাজিক কাঠামোকে নীরবে নষ্ট করে দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো সুস্থ বিনোদনের অভাব। একটি শহরের তরুণ প্রজন্ম যদি তাদের অবসর সময় কাটানোর জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ না পায়, তবে তারা সহজেই ভুল পথে পা বাড়ায় এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। পীরগঞ্জেও যেন সেই বাস্তবতাই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
পীরগঞ্জে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্ক, লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা খেলাধুলার উপযোগী উন্মুক্ত মাঠের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরা সময় কাটানোর জন্য বিকল্প কোনো ইতিবাচক প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায় না। এই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই ঝুঁকে পড়ছে মোবাইল আসক্তি, অনলাইন গেমিং কিংবা আরও ভয়ংকরভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিক আব্দুল কাদের বলেন, “আগে বিকেলে মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা করতে দেখা যেত। এখন সেই মাঠ নেই, নেই কোনো পার্ক। ফলে তারা বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাটে সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছে।”
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্কুলশিক্ষক ও অভিভাবক রোকসানা পারভীন। তিনি বলেন, “আমাদের সন্তানরা এখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে সবসময় খেয়াল রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু যদি শহরে ভালো কোনো বিনোদন বা শিক্ষামূলক পরিবেশ থাকত, তাহলে তারা অন্তত নিরাপদ জায়গায় সময় কাটাতে পারত।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অভিভাবক মাহবুব আলমের ভাষ্য আরও সরাসরি: “সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় অচেনা কিশোরদের জটলা দেখা যায়। তাদের অনেকেই মাদক বহন বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে শোনা যাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর সংকেত।”
বাসিন্দাদের মতে, বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া বয়সী কিছু কিশোর মাদক পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এই বয়সে তারা শুধু নিজের ভবিষ্যৎই ধ্বংস করছে না, বরং পুরো সমাজকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। কারণ সমস্যার শিকড় কেবল অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক শূন্যতায়। যখন একটি কিশোর তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায় না, তখন সে সহজেই ভুল প্রভাবের শিকার হয়। এই জায়গায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের জন্য বিকল্প ইতিবাচক ব্যস্ততা তৈরি করা। যেমন—খেলাধুলার টুর্নামেন্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাঠাগার, বিতর্ক ক্লাব বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। এসব উদ্যোগ কিশোরদের শুধু ব্যস্তই রাখে না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও বৃদ্ধি করে।
পীরগঞ্জ পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসন চাইলে এই সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিত্যক্ত জমি বা খালি জায়গাগুলোকে খেলার মাঠ বা পার্কে রূপান্তর করা, নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন করা এবং স্কুলভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা জরুরি। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, পীরগঞ্জের বর্তমান নিরাপত্তাহীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। এখনই যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত পীরগঞ্জ গড়ে তুলতে হলে কিশোরদের জন্য বিকল্প ইতিবাচক জগত তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।