
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ১ এপ্রিল(বুধবার) রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থেকে আসা শিশুটির বয়স ৯ মাসের কম বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হলো।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, শিশুটি এর আগে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল বুধবার রাতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) নেওয়া হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার সকালে হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। ওই শিশুটিও কক্সবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল এবং তার বয়স ছয় মাসের কম বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে আরেকটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাকে কুতুবদিয়া থেকে প্রথমে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে আটজনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ১৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে হামের লক্ষণযুক্ত ১১১ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
রোগ বাড়লেই সামনে আসে চিকিৎসা সংকটঃ
চট্টগ্রামে কোনো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়লেই চিকিৎসাসেবার নানা ঘাটতি সামনে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। হামসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের অনেক পরীক্ষাই এখনও ঢাকায় পাঠিয়ে করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকায় ২৫০ শয্যার এবং হাটহাজারী উপজেলায় ৫০০ শয্যার দুটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব হাসপাতালের জন্য জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে নির্মাণ প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। এদিকে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় নতুন একটি হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সুবিধা বিবেচনায় উপযুক্ত স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ করা গেলে মানুষ উপকৃত হবে। তবে বর্তমানে হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে।
সরঞ্জাম ও জনবলের ঘাটতিঃ
করোনা, ডেঙ্গু, আগুনে পোড়া বা হামসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোগীরা চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে নানা ভোগান্তির মুখে পড়েন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফৌজদারহাট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা সদর হাসপাতালেও চিকিৎসা সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা উপকরণ থাকলেও তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল জনবল নেই।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে এক যুগ আগে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও জনবলের পদ সৃজন করা হয়নি। হাসপাতাল পরিদর্শনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নানা পরিকল্পনার কথা বললেও বাস্তবে অগ্রগতি খুবই কম বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
আগুনে পোড়া রোগীদের দুর্ভোগঃ
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন আগুনে পোড়া রোগীরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ শয্যার একটি বার্ন ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই। নেই আইসিইউ, অপারেশন সুবিধা কিংবা প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল। ফলে ২০ শতাংশের বেশি দগ্ধ রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠাতে হচ্ছে। সম্প্রতি নগরের হালিশহরে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের নয়জন দগ্ধ হলে তাদের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়। তাদের চিকিৎসার জন্যও ঢাকায় নিতে হয়েছিল।
নেই হাম পরীক্ষার ল্যাবওঃ
চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হলেও এখানে এখনও হামের নমুনা পরীক্ষার কোনো ল্যাব নেই। ফলে রোগ শনাক্তের জন্য নমুনা পাঠাতে হয় ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল)।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম থেকে ৯১টি নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। হাম, রুবেলা ও জন্মগত রুবেলা সিনড্রোম শনাক্তের ক্ষেত্রে এনপিএমএল দেশেই একমাত্র রেফারেন্স ল্যাব হওয়ায় সারা দেশের নমুনা সেখানেই পরীক্ষা করা হয়। ফলে রিপোর্ট পেতে সময় লাগছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার বাইরে কোনো ল্যাব না থাকায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকাতেই পাঠাতে হচ্ছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা হিসেবে চট্টগ্রামেও একটি আধুনিক ল্যাব স্থাপন জরুরি।
চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বড় শহরগুলোতে উন্নত চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। হামের মতো একটি রোগ শনাক্তের জন্যও চট্টগ্রামে ল্যাব না থাকা দুঃখজনক।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে হামের নমুনা পরীক্ষার কোনো ল্যাব নেই। তাই উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের নমুনা ঢাকার এনপিএমএলে পাঠানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা হয়নি, তবে স্থানীয়ভাবে একটি ল্যাব স্থাপন জরুরী।







