
মো হাসান মাহমুদ জয় স্টাফ রিপোর্টার কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের কচাকাটা থানার একটি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নদীভাঙন, চরম দারিদ্র্য এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত করা মিজানুর রহমান মিজান আজ একজন সফল উদ্যোক্তা, অনন্য সংগঠক এবং সমাজ উন্নয়নকর্মী হিসেবে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ সংগ্রামমুখর পথ অতিক্রম করে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, যা আজ দেশের লাখো তরুণের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণার উৎস।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করার পর আর দশটা যুবকের মতো সনাতন চাকরির পেছনে না ছুটে, তিনি স্বাধীন উদ্যোক্তা হওয়ার চ্যালেঞ্জিং পথ বেছে নেন এবং কঠোর পরিশ্রম, অটল আত্মবিশ্বাস ও ব্যবসায়িক সততাকে পুঁজি করে রাজধানী ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন গার্মেন্টস শিল্পপ্রতিষ্ঠান “তূর্য সোয়েটারস”।
শূন্য থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের পোশাক শিল্পে এক নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি শত শত বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব দূরীকরণে রাখছে এক অনন্য ভূমিকা।
ব্যবসায়িক সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও মিজানুর রহমান মিজান ভুলে যাননি তাঁর শেকড়ের কথা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা।
নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অরাজনৈতিক ও সেবামূলক সংগঠন “রশিদ মন্ডল ফাউন্ডেশন”, যা দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পিছিয়ে পড়া ও চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই ফাউন্ডেশনটির বহুমুখী সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অর্থাভাবে শিক্ষাজীবন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও উপবৃত্তি প্রদান, চরাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো ও জরুরি ওষুধ বিতরণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি। একই সাথে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘স্বাবলম্বী প্রকল্প’-এর আওতায় ছাগল ও সেলাই মেশিন বিতরণ, গৃহহীন পরিবারের জন্য টেকসই ঘর নির্মাণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে হুইলচেয়ার বিতরণসহ নানাবিধ কল্যাণমুখী কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশ ও দশকের যেকোনো মানবিক সংকটে এই ফাউন্ডেশন সবসময় প্রথম সারিতে দাঁড়িয়েছে, যার প্রমাণ মেলে ২০২২ সালের সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় দুর্গত মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং ২০২৪ সালে কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীর স্মরণকালের বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাপক ত্রাণ, শুকনো খাবার ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করাসহ বন্যা-পরবর্তী মহামারি ঠেকাতে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করার মাধ্যমে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, ইসরায়েলি আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত ফিলিস্তিনের গাজাবাসীর চরম দুর্দশার সময়ে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে রশিদ মন্ডল ফাউন্ডেশন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। মিজানুর রহমান মিজান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, বরং সমাজের বিত্তবান ও সচেতন প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব রয়েছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তাঁর মতে, “মানুষ মানুষের জন্য”—এই চিরন্তন মানবিক দর্শনকে বুকে ধারণ করে যদি সবাই এগিয়ে আসে, তবেই একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সহমর্মী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। একজন দূরদর্শী তরুণ নেতা হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের আসল চালিকাশক্তি হলো এর যুবসমাজ। চরের এক সাধারণ কোণ থেকে উঠে এসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখা এই স্বপ্নবাজ কর্মবীরের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন তরুণদের শেখায়—হতাশ না হয়ে কীভাবে প্রতিকূলতাকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে হয়। ভবিষ্যতে চরাঞ্চলের প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছানো এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর, এবং তাঁর এই ঈর্ষণীয় সাফল্য ও নিঃসার্থ মানবিক কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করতে এক যুগান্তকারী আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।






