
– সাংবাদিক পলাশ রহমান
নোয়াখালী প্রতিদিন
জামায়াতে ইসলামী অবশেষে তাদের চূড়ান্ত আসন বণ্টনের ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষিত হিসাব অনুযায়ী, মামুনুল হকের দলকে দেওয়া হয়েছে ২০টি আসন, মজলিসের আরেকটি শাখাকে ১০টি, এনসিপিকে ৩০টি এবং অলি আহমেদের দলকে ৭টি আসন।
এই বণ্টন ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। সারাদেশে এনসিপির ভোটের হার কত? মামুনুল হকের দলের সাংগঠনিক শক্তি বা গণভিত্তি কতটুকু? অলি আহমেদের দলের নাম বা নির্বাচনী প্রতীকই বা কজন ভোটার চেনেন? যদি আসন বণ্টনে ন্যায় ও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হতো, তাহলে এসব দলের তুলনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রাপ্য আসনসংখ্যা কত হওয়া উচিত ছিল?
বাস্তবতা হলো—এনসিপি যদি ৩০টি আসন পায় এবং মামুনুল হকের দল এককভাবে ২০টি আসন পায়, তাহলে ইসলামী আন্দোলনের ভাগে কি মাত্র ৪০–৪৫টি আসনই আসার কথা? তাও আবার এই আসনগুলোর সবকটি ইসলামী আন্দোলনকে এককভাবে দেওয়া হয়নি। বহু আসন ‘উন্মুক্ত’ রাখা হয়েছে—যেখানে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লা উভয় প্রতীকই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এর অনিবার্য ফল হলো, ইসলামী আন্দোলনের কার্যকর একক আসনসংখ্যা নেমে আসবে ৩০-এরও নিচে।
এই পুরো কৌশলের উদ্দেশ্য একটাই—এনসিপিকে কৃত্রিমভাবে দ্বিতীয় প্রধান শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো এবং ইসলামী আন্দোলনকে তৃতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়া।
আরও গুরুতর বিষয় হলো—ইসলামী আন্দোলনকে যেসব আসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি আসনেও তাদের সম্ভাবনাময় প্রার্থী নেই। যেখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা ছিল, সেসব আসন জামায়াত নিজের দখলে রেখেছে।
বাস্তবে জামায়াত ‘এক বাক্স’ নীতির সমঝোতায় নেমেছিল বগলে ‘ইট’ নিয়ে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই তারা ৪৭টি আসন উন্মুক্ত রেখে চূড়ান্ত বণ্টন করেছে, যাতে প্রয়োজনে সমঝোতা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার দায় ইসলামী আন্দোলনের ওপর চাপানো যায়।
ইসলামী আন্দোলন হয়তো ৪০–৫০টি আসন মেনেও নিত, যদি আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে তাদের সম্ভাবনাময় আসনগুলো ছেড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু জামায়াত তা করেনি। বরং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের পথ বেছে নিয়েছে। উপরন্তু, তারা বাজারে একের পর এক মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছে—যেমন ইসলামী আন্দোলন নাকি ১৫০ আসন দাবি করেছে, নির্বাচিত হলে পীর সাহেব চরমোনাইকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছে, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় লিখিতভাবে দাবি করেছে। এসব অভিযোগের একটিরও কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত হাজির করা যায়নি।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগ আরও সুস্পষ্ট। তারা বলেছে—জামায়াত কোনো আলোচনা ছাড়াই তিনটি দলকে সমঝোতায় যুক্ত করেছে, দিনের পর দিন আসন বণ্টন নিয়ে মিটিং ঝুলিয়ে রেখেছে, বারবার নির্ধারিত সভা বিনা নোটিসে বাতিল করেছে এবং ইসলামী আন্দোলনকে অন্ধকারে রেখে এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই অভিযোগগুলোর একটিও জামায়াত অস্বীকার করতে পারেনি। বরং সব অভিযোগই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
শুরু থেকেই জামায়াত এই সমঝোতাকে ‘নির্বাচনী জোট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সাংবাদিকরা যখন একে জোট বলতেন, ইসলামী আন্দোলনের নেতারা তখন বারবার সংশোধন করতেন। কিন্তু জামায়াতের কোনো নেতা কখনোই সেই সংশোধনে আগ্রহ দেখাননি। কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন—‘এক বাক্স’ নীতির উদ্যোক্তা সৈয়দ রেজাউল করিমকে আড়াল করে নতুন নামে ‘নির্বাচনী ঐক্য’ ধারণা চাপিয়ে দেওয়া।
আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইসলামী আন্দোলন যদি এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে জামায়াত কৌশলে দুই শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে—উন্মুক্ত রাখা ৪৭টি আসনসহ। অথচ ইসলামী আন্দোলন আগেই ২৮৬ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়ে রেখেছে। ফলে তারা এককভাবে মাঠে নামলে বহু আসনে জামায়াতের পরাজয় কার্যত অনিবার্য।
ধর্মপ্রাণ ভোটারদের ভোট ভাগ হয়ে পড়বে হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। আমার অনুমান, অন্তত ১১৫টি আসনে ধানের শীষের বিপরীতে জামায়াত হাতপাখার কারণে কার্যকর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারবে না।
জামায়াত যদি এই দুষ্টু ও স্বার্থপর রাজনীতির পথে না হাঁটত, তাহলে দেশের শাসনক্ষমতায় বাস্তব কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। কিন্তু তারা নিজের নাক কেটে ইসলামপন্থীদের সামগ্রিক উত্থানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করলো।







