
রংপুর ব্যুরোঃ
আদালতের দ্বারস্থ হয়েও মেলেনি স্থায়ী সমাধান, প্রভাবশালীদের দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দাপটে নিজ ভিটায় পরিবার নিয়ে ফিরতে পারছে না আটোয়ারীর ফজলুর রহমান। পরিবার পরিজন নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে তার।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের নলপুখুরী গ্রামে প্রায় এক বছর ধরে নিজেদের পৈত্রিক বসতভিটায় উঠতে পারছে না ফজলুর রহমানের পরিবার। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালীদের দখল, ভয়ভীতি ও ক্ষমতার প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে অন্যের বাড়িতে ভাড়ায় থেকে স্ত্রী সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভুক্তভোগী ফজলুর রহমান।
প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার পাশাপাশি
স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার সালিশে সমাধান না হওয়ায় মামলা গড়ায় আদালতে। মামলা করার পরও মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান। বরং উল্টো নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, কয়েক পুরুষ ধরে নলপুখুরী গ্রামে বসবাস করে আসছিলেন তারা। পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এরই একপর্যায়ে বাড়িঘর ও বাড়ি সংলগ্ন জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে তারা আমাদের বাড়িঘর ভাংচুর করে এবং বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বেশ কিছুদিন স্ত্রী সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকার পর স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে একটি সালিশি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে আমাদেরকে বাড়ি করার জন্য সাড়ে পাঁচ শতক জমি ফিরিয়ে দিলেও বাড়ি নির্মাণ করতে দেয় নাই। পরক্ষণে কৌশলে কেড়ে নেয়। এর পর থেকে এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছি।
সরেজমিনে গিয়ে ফজলুর রহমানের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
ফজলুর রহমানের আপন ভাতিজা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এ কর্মরত প্রকৌশলী মকবুল হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে তার অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন।
শুধু তাই নয়, প্রকৌশলী মকবুল হোসেন ও তার সহযোগীরা ফজলুর রহমানের ক্রয়কৃত প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ফজলুর রহমান বলেন,
“আমরা এখন নিজের বাড়িতে থাকতে পারি না। আদালতে গেছি, চেয়ারম্যানের কাছে গেছি, প্রশাসনের কাছে গেছি। কিন্তু আজও বিচার পাইনি। পরিবার নিয়ে এখন ভাড়া বাসায় অনেক কষ্টে আছি।
তার ভাষ্যমতে, একসময় যে বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন, আজ সেই বাড়ির আশপাশেও যেতে পারেন না তারা। এলাকায় গেলে নানা ধরনের হুমকি ও অপমানের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পৈত্রিক ভিটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফজলুর রহমানদের সঙ্গে আত্মীয়স্বজনদের জমিজমা ও বসতভিটা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। তবে গত বছরের দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহল নিজেদের দখল বজায় রাখতে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। এতে অসহায় হয়ে পড়েন ফজলুর রহমান ও তার পরিবার।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ তাদের বসতঘর এবং নির্মাণাধীন টয়লেট ও গোসলখানাও দখলে নিয়ে ব্যবহার করছে প্রতিপক্ষরা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী মকবুল হোসেনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, মামলা-মোকদ্দমার কারণেই বিরোধ আরও বেড়েছে। তবে ফজলুর রহমানদের জমি বা স্থাপনা ব্যবহারের বিষয়টি আংশিকভাবে স্বীকার করেন পরিবারের কয়েকজন সদস্য।
ফজলুর রহমানের পরিবারের এক সদস্য স্থানীয়ভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ তুলেছেন। ফজলুর রহমানের পরিবারটির দাবি, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার কারণেই বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে তাদের।
গণমাধ্যমকর্মী ফজলুর রহমানের বড় মেয়ে রোজিনা আক্তার বলেন,
আমি গণমাধ্যমে কাজ করি বলেই আমাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার বিশ্বাস, একদিন আমরা আমাদের ভিটায় ফিরে যেতে পারব।
স্থানীয় সচেতন মহলেরও একই ধরনের বক্তব্য। তাদের মতে, একটি পরিবারকে দীর্ঘদিন নিজ বসতভিটা থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক এটি সামাজিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একজন স্থানীয়রা বলেন, ফজলুর রহমানরা অনেক বছর ধরেই এখানে ছিল। এখন প্রভাবশালীদের কারণে বাড়ি ভিটাতে উঠতে পারতেছে না। বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। সালিশ করেও মেলেনি সমাধান। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একাধিকবার সালিশ বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। তবে উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে কোনো সমাধান হয়নি।
স্থানীয় চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার বসেছি। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি। পরে বিষয়টি আদালতে গেছে। স্থানীয়দের মতে, সালিশে সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন ফজলুর রহমান।
আদালতের নির্দেশে তদন্ত চলমান
আদালতে মামলা দায়েরের পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আমরা আদালতের একটি আদেশ পেয়েছি। সেই অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
তবে তদন্ত চলমান থাকলেও এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। এতে করে পরিবারটির মধ্যে হতাশা বাড়ছে।স্থানীয়দের দাবি দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।প্রথমদিকে তারা খোলা আকাশের নিচে ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও বর্তমানে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছে।
ফজলুর রহমানের স্ত্রী জানান, বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর তাদের স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সন্তানদের পড়াশোনা,দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং সামাজিক সম্পর্ক সবকিছুতেই প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, নিজের বাড়ি থাকতে অন্যের বাসায় থাকতে খুব কষ্ট হয়। প্রতিদিন মনে হয়, কবে আবার নিজের ঘরে ফিরতে পারব।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও। স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন,
এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। তাদেরকে অনেকবার বলেছিলাম যেন বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ না করা হয়। কিন্তু আমাদের কথা না শুনে নিজেদের পেশিশক্তি ব্যবহার করে এ কাজ করা হয়েছে। অবশ্যই এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া দরকার। তার মতে, সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধের সমাধান আইনের মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। শক্তি বা প্রভাব খাটিয়ে কাউকে উচ্ছেদ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, এ ধরনের ঘটনা গ্রামীণ সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সহজে কথা বলতে সাহস পায় না। ফলে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
একাধিক ব্যক্তি জানান, এলাকায় বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে তারা ফজলুর রহমান ও তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
ওই গ্রামের একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, একটা পরিবার যদি নিজের ভিটায় থাকতে না পারে, এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, যদি আদালতের নির্দেশনা ও তদন্ত চলমান থাকে, তাহলে এখনো কেন পরিবারটি নিরাপদে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছে না। তাদের মতে, তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারটিকে নিরাপত্তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
একদিকে আদালতের নির্দেশনা, অন্যদিকে জমি দখল ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ফজলুর রহমান ও তার পরিবারের। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িছাড়া অবস্থায় থাকার ফলে মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
এখন প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের রায়ের বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগীরা। নিজেদের পৈত্রিক ভিটায় নিরাপদে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান তারা।







