
কবির হোসেন রাকিব , নিকলী
(কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত শান্ত জনপদ নিকলী এখন মাদকের মরণনেশায় অস্থির। একসময়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি এখন ইয়াবা, গাঁজা, দেশি-বিদেশি মদ, ড্যান্ডি এবং অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা, যা কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ এবং ধ্বংস করছে শত শত পরিবার।
বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও অপরাধের গ্রাস
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিশোর ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ এই নেশার জালে আটকা পড়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে, ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ চিত্র
নিকলীর সামাজিক স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে। সম্প্রতি নেশার টাকা না পেয়ে দামপাড়ায় নিজ ঘরে আগুন দেওয়ার মতো উগ্র ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মাদকাসক্ত ছেলের হতাশায় শ্মশানখলায় ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার ঘটনা পুরো উপজেলাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনা কেবল শোকের নয়, বরং এক ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও গডফাদারদের দাপট
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের আটক করলেও আইনি ফাঁকফোকরে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে। জেল থেকে ফিরে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে মাদক ব্যবসায় লিপ্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠন সোচ্চার হলেও নেপথ্যের গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
ঝুঁকিতে আগামী প্রজন্ম
স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা এখন ‘ড্যান্ডি’ (জুতার আঠা) এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর সিরাপে আসক্ত হয়ে পড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এসব নেশাদ্রব্য স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করছে। সন্তানদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা।
সুশীল সমাজের দাবি
নিকলীর সুশীল সমাজের দাবি—কেবল লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং মাদকের মূল রুট বন্ধ করতে হবে। মাদক বিক্রেতাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বয়কট করা এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, প্রশাসন যদি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে সাঁড়াশি অভিযান না চালায়, তবে অচিরেই এই জনপদ তার মেধা ও জনশক্তি হারিয়ে এক অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাবে।
একটি শান্তিপূর্ণ ও মাদকমুক্ত নিকলী গড়তে এখন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ও আপোষহীন প্রতিরোধের বিকল্প নেই।







