
হাসিনুজ্জামান মিন্টু
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
একসময় ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। নতুন কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দর্শকের ঢল নামত। টিকিট সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই কোলাহল থেমে গেছে। এখন জেলার কোথাও আর একটি সিনেমা হলও চালু নেই।
একসময় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বলাকা, রূপশ্রী, মৌসুমী, আলেয়া, নাজ, মুক্তা, পলাশ, নূর, মডার্ন, পাভেল, পূর্ণিমা ও চাঁদনীসহ মোট ১৬টি সিনেমা হল ছিল। এসব হল শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের স্থানই ছিল না, স্থানীয় সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বর্তমানে সবকটিই বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হওয়ার পর অধিকাংশ হলের ভবনের ব্যবহারও বদলে গেছে। কোথাও গড়ে উঠেছে হাসপাতাল বা ক্লিনিক, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও বাণিজ্যিক মার্কেট কিংবা গুদাম। ঠাকুরগাঁও শহরের ঐতিহ্যবাহী বলাকা সিনেমা হল ভবনে বর্তমানে ক্লিনিক নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে মৌসুমী সিনেমা হলের ভবনটি গুদাম হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যেসব ভবন এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোতেও আর চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় না।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় জনপ্রিয় সিনেমা মুক্তি পেলে আশপাশের উপজেলা থেকেও মানুষ দলবেঁধে ঠাকুরগাঁও জেলার প্রতিটি উপজেলায় আসতেন। অনেক সময় ট্রাক, মিনিবাস বা ভ্যান ভাড়া করে সিনেমা দেখতে আসার ঘটনাও ছিল নিয়মিত। সেই প্রাণবন্ত পরিবেশ এখন শুধুই স্মৃতির অংশ।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাব, সিনেমা হলের জরাজীর্ণ অবস্থা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সংকট এবং মোবাইল ও অনলাইনভিত্তিক বিনোদনের প্রসারের কারণে ধীরে ধীরে দর্শকশূন্য হয়ে পড়ে হলগুলো।
ঠাকুরগাঁও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রিজু বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেকেই কখনো সিনেমা হলে বসে চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়নি। উন্নত অবকাঠামো, ভালো চলচ্চিত্র এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে সিনেমা হল সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসতে পারে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো উদ্যোক্তা বন্ধ সিনেমা হল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। প্রয়োজনে স্বল্পসুদে ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তার সুযোগও রাখা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে একদিন হয়তো আবারও আলো জ্বলবে ঠাকুরগাঁওয়ের সিনেমা হলের পর্দায়, ফিরে আসবে জেলার হারিয়ে যাওয়া সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।







