
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার এক কোণে নীরবে টিকে আছে এক পরিবারের শতবর্ষী ঐতিহ্য—সুরের সঙ্গে বেঁচে থাকা, আর সেই সুরকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রার সূচনাকারী বঙ্কু চন্দ্র দাস। সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলেছে, কিন্তু দাস পরিবারের পেশা ও পরিচয় যেন একই সুরে বাঁধা থেকেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
বঙ্কু চন্দ্র দাস ছিলেন একাধারে শিল্পী ও কারিগর। তিনি শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন না, সেগুলো তৈরি ও মেরামতের কাজেও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যেও এই সুরের ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ে। পারিবারিকভাবে সংগীতচর্চা আর বাদ্যযন্ত্রের কারিগরি দক্ষতা যেন তাঁদের রক্তের ভেতরেই প্রবাহিত হতে থাকে। এই পরিবার কখনো জমিদার বা প্রভাবশালী ছিল না, কিন্তু তাদের সামাজিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন পরিচয়ে সুরের কারিগর হিসেবে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে বিনোদনের ধরণ বদলাতে শুরু করে। গ্রামীণ জীবনে একসময় যেসব বাদ্যযন্ত্র ছিল অপরিহার্য দোতারা, ঢোল, ডুগি তবলা, হারমোনিয়াম সেগুলোর চাহিদা কমতে থাকে। তবুও দাস পরিবার তাদের ঐতিহ্য ছেড়ে যায়নি। বরং তারা চেষ্টা করেছে সেই সুরের ধারাকে টিকিয়ে রাখতে।
এই ধারাবাহিকতায় পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ এক নাম মন্টু চন্দ্র দাস। প্রায় ৭৫ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে বাদ্যযন্ত্রের সুর ঠিক করতে করতে। ভাঙা দোতারাকে নতুন করে সুরে ফেরানো, হারমোনিয়ামের বায়ু ঠিক করা, ডুগি তবলার চামড়া টানটান করা এসবই ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ। তাঁর হাতের স্পর্শে যেন যন্ত্রগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেত।
মন্টু চন্দ্র দাস শুধু একজন কারিগরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ঐতিহ্যের ধারক। তিনি বুঝতেন, এটি শুধুমাত্র জীবিকা নয় এটি একটি সংস্কৃতির অংশ, একটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখেছেন এই পেশার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সাউন্ডের আকর্ষণ বেশি হয়ে উঠেছে।
তবুও এই ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে যায়নি। মন্টুর উত্তরসূরি হিসেবে এখন দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর পুত্র আনন্দ চন্দ্র দাস। বয়স মাত্র ৩৫, কিন্তু তাঁর কাঁধে যেন শত বছরের ভার। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি শিখেছেন বাদ্যযন্ত্র মেরামতের সূক্ষ্ম কৌশল। কোন তার কতটুকু টানতে হবে, কোন কাঠে কীভাবে শব্দের কম্পন তৈরি হয় এসব তার কাছে বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা।
আনন্দ চন্দ্র দাস এখনো দোতারা, হারমোনিয়াম, ডুগি তবলা, ঢোল ও ড্রাম মেরামত করেন। তবে তাঁর পথ সহজ নয়। আগের মতো আর তেমন কাজ আসে না। অনেকেই এখন নতুন যন্ত্র কিনতে পছন্দ করেন, পুরনো মেরামত করার আগ্রহ কমে গেছে। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। তাঁর বিশ্বাস, এই পেশার মধ্যেই তাঁর পরিচয়, তাঁর শিকড়।
দাস পরিবারের এই গল্প শুধুমাত্র একটি পরিবারের নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির এক প্রতিচ্ছবি। যেখানে পেশা মানে শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং একটি জীবনদর্শন। কিন্তু এই ঐতিহ্য আজ ঝুঁকির মুখে। প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, সাংস্কৃতিক মূল্যায়ন এবং নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ।
সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি এই ধরনের কারিগরদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং কাজের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে হয়তো এই সুরের ধারা আবারও নতুন করে জেগে উঠতে পারে। কারণ, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মাটির গন্ধমাখা এই বাদ্যযন্ত্রের সুর কখনোই সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে না—যদি থাকে এমন কিছু মানুষ, যারা সেই সুরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
পীরগঞ্জের দাস পরিবারের গল্প তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।






